যে রোগে সন্তান জন্মদানের সময় মারা যেতে পারেন মা

আটত্রিশ বছরের রহিমা। ২ সন্তানের মা। দীর্ঘদিন পর আবার মা হতে যাচ্ছেন। প্রসব বেদনা শুরু হলো, কিন্তু প্রসব হচ্ছে না। ভীষণ ব্যাথায় গর্ভধারিণী ছটফট করছেন। ৪/৫ ঘন্টা পর যোনি পথ দিয়ে প্রস্রাব ঝরছে।আরো কিছু সময় পর মলমুত্র একাকার হয়ে ঝরছে। যোনিপথ ছাড়াও আশ পাশের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র হয়ে রক্ত মলমূত্র মিলে মিশে একাকার হয়ে ঝরছে। কিন্তু প্রসব হচ্ছে না, গর্ভধারিণীর ছটফট ও ভীষণ ব্যাথায় কান্না-চিৎকার রেড়েই চলছে। এভাবে প্রায় ১২ ঘন্টার পর রহিমার শরীর নিথর হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মা ও অনাগত নবজাতক দু’জনেরই জীবন প্রদীপ অকালে নিভে গেল।
শুধু রহিমা নয়। দেশে হাজার হাজার রহিমা প্রতিবছর এই রোগে মারা যাচ্ছেন। এই রোগের নাম ফিস্টুলা। এই রোগে আক্রান্ত নারীরা প্রসবকালীন সময় অনেক বেশি সমস্যায় ভোগেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে ১০-২০ লাখ নারী ফিস্টুলায় ভোগছেন। প্রতি বছর ৫০ হাজার থেকে এক লাখ নারী নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই সমীক্ষায় আরো বলা হয়, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় ৫০টি দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ফিস্টুলায় ভোগছেন। বাংলাদেশে প্রায় ৭২ হাজার নারী ফিস্টুলার মতো বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে বাস করছেন।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিয়ে আর্ন্তজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশের ফিস্টুলা কেয়ার প্লাস প্রকল্প ব্যাবস্থাপক ডা. শেখ নাজমুল হুদা বলেন, একজন নারী পূর্ণতা লাভ করেন মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জন্মদান পর্যন্ত একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা ঐ নারীর জীবন জটিল সমস্যায় পড়তে পারে। তেমনি একটি জটিল ও কঠিন সমস্যার নাম ফিস্টুলা বা প্রসবজনিত ফিস্টুলা। বাংলাদেশে আনুমানিক ৭২ হাজার নারী প্রসব জনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন।
এই বিষয়ে বিস্তারিত বলার আগে জানতে হবে প্রসবজনিত ফিস্টুলা কি?
যোনীপথ, মূত্রাশয় ও মলদ্বারের মাঝখানে কোনো অস্বাভাবিক পথ তৈরি হলে একে প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলে। ফলে কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রস্রাব-পায়খানা বের হয়ে যায়। প্রসবের সময় যদি বাচ্চার মাথা যোনিপথের মুখে আটকে যায় এবং তা দীর্ঘ সময় আটকে থাকে তবে বাচ্চার মাথার সামনের অংশ দ্বারা মূত্রথলী এবং পিছনের অংশ দ্বারা পায়ুপথ চাপের মুখে থাকে। দীর্ঘ সময় চাপে থাকার ফলে এসব অঙ্গসমূহে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং তাতে পচন ধরে। পচনযুক্ত টিস্যু খসে কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে ছিদ্র সৃষ্টি হয়। মূত্রথলী ও যোনিপথের বা পায়ুপথ ও যোনিপথের মধ্যে সৃষ্ট এই ছিদ্রের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। ছিদ্র পথে এসব নারীদের অনবরত প্রস্রাব বা পায়খানার রস ঝরতে থাকে। একেই প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলা হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় নারীর মৃত্যু বা মা ও সন্তানের মৃত্যু বা মৃত সন্তান প্রসব করেন।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন: ভেসিকো-ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা, এটি মূত্রাশয় এবং যোনিপথের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইউরেথ্রো-ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা, মূত্রনালী এবং যোনিপথের মধ্যে হয়ে থাকে। রেক্টো- ভ্যাজাইনাল ফিস্টুলা, মলদ্বার এবং যোনিপথের মধ্যে হয়ে থাকে।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা কেন হয়
যদি মায়ের পেলভিসের হাড় ও বাচ্চার মাথার মাঝে সমতা না থাকে, অর্থাৎ মায়ের পেলভিসের তুলনায় বাচ্চার মাথা যদি বড় থাকে অথবা পেলভিস প্রয়োজনের তুলনায় ছোট থাকে, তাহলে প্রসব বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাচ্চা দীর্ঘক্ষণ (১-৩) দিন প্রসবের রাস্তায় আটকে থাকলে ও যদি বাচ্চা যথাসময়ে বের না হয় তাহলে মায়ের পেলভিসের (শ্রোনীচক্রের) হাড় ও বাচ্চার মাথার মাঝে মূত্রথলি দীর্ঘক্ষণ চাপের ফলে প্রসবজনিত ফিস্টুলা হয় এবং সাধারণত ডেলিভারির সাত/আটদিন পর থেকেই প্রস্রাব ঝরা শুরু হয়।
অল্পবয়সে বিয়ে, বিয়ের পর পরেই গর্ভধারণ, নিয়মিত চেকআপে না থাকা, বিলম্বিত প্রসব হয়ে বাচ্চার মাথা অনেকক্ষণ আটকে থাকা, অদক্ষ ধাত্রী দিয়ে ডেলিভারি করানো, সময় মতো হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেয়া ইত্যাদি প্রসবজনিত ফিস্টুলার অন্যতম কারণ।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার লক্ষণ ও উপসর্গ
ফিস্টুলার আকার এবং এটি হওয়ার স্থানের উপর নির্ভর করে এর লক্ষণ ও উপসর্গগুলো সাধারণত: ভিন্ন হয়। যেমন: প্রস্রাব, পায়খানা ও পুঁজ যোনিপথ দিয়ে বের হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব হওয়া, যোনিপথের এবং প্রস্রাবের রাস্তায় বার বার সংক্রমণ হওয়া, শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের সময় ব্যথা অনুভব করা, ঘনঘন পায়খানা হওয়া এবং পায়খানা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া, পায়ুপথের ভেতরের গ্রন্থিতে সংক্রমণের কারণে মলদ্বারের পাশে ফুলে ওঠে ও ব্যথা হয়।
সংক্রমণ যদি মলদ্বারের গভীরে প্রবেশ করে তখন ফোলা থাকে না। কিন্তু প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বরও হতে পারে। এভাবে বারে বারে চলতে থাকে।
এক্ষেত্রে মলদ্বারের দূরে (আধা ইঞ্চি থেকে চার ইঞ্চি) একটি ছোটমুখ থাকে যা দিয়ে পুঁজ ও রক্ত বের হয়। কারো কারো এ মুখটি এতো ছোট যে দেখা যায় না। তারা বলেন যে, মলদ্বারে একটু ভেজা ভেজা লাগে বা আঠালো পদার্থ বের হয়। উপরোক্ত লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেখা দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
কিভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধ করা যায়- ফিস্টুলা দূর করতে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রসবকালে সব নারীর পাশে দক্ষ সেবাদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রসবজনিত জটিলতায় জরুরি সেবা দেয়ার মাধ্যমে ফিস্টুলাকে প্রায় নির্মূল করা যেতে পারে। বাসস/ইউনিসেফ ফিচার।

নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন